পুতিনের পথে হাঁটছেন এরদোয়ান

পুতিনের পথে হাঁটছেন এরদোয়ান

single image

তুরস্ক কি নব্য রাশিয়া—ইউরোপের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে দিন দিন এই প্রশ্নটা উঠছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যেভাবে আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটছেন, তাতে এমন প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) তাদের দিকে অভিবাসীর স্রোত ঠেলে দেওয়ার হুমকির পাশাপাশি এরদোয়ান এখন আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলে সামরিক শক্তি মোতায়েন করছেন।

সেই শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই ইউরোপিয়ানরা পশ্চিমা আতশি কাচের ভেতর দিয়ে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার পথ খুঁজে এসেছে। ন্যাটো এই অঞ্চলের সামরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৮০ হাজার পৃষ্ঠার রুলবুক সমকামীদের অধিকার থেকে শুরু করে লনের ঘাসকাটার যন্ত্রের শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয় পর্যন্ত আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে।

নব্বইয়ের দশকের আগে ব্যাপকভাবে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল, একসময় রাশিয়া ও তুরস্ক—এই দুটি অ-পশ্চিমা দেশকেও এই ছাতার তলে আনা হবে। কিন্তু ১৫ বছর ধরে ইউরোপের এক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবতায় এসে বহুধাবিভক্ত অবস্থায় ধরা দিয়েছে।

ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়া ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও ঘৃণার মিশ্রিত সম্পর্ক। এই দুটি দেশের জাতীয় নেতাদের বরাবরই জেদি প্রকৃতির হিসেবে দেখা গেছে এবং তাঁরা ইইউর নিয়মকানুন ও মূল্যবোধকে প্রায়শই অবজ্ঞা করেছেন।

ইইউর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি অনেক আগে থেকেই প্রমাণিত। কিন্তু ইইউ-তুরস্কের সম্পর্ক ততটা শীতল ছিল না। কিন্তু ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ ইইউর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে জটিল করে ফেলে। এরপর ২০০৭ সালে তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া ফ্রান্স আটকে দিলে ইইউর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক খুব খারাপ অবস্থায় নেমে আসে। তখন থেকেই সিরিয়া, বলকান অঞ্চল এবং লিবিয়ায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে তুরস্ক। পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলে দেশটি।

স্বীকার্য যে তুরস্ক ও রাশিয়ার সম্পর্কও কম জটিল নয়; কারণ, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এরদোয়ান ও পুতিন পরস্পরবিরোধী পক্ষে মদদ দিচ্ছেন। ২০১৫ সালে তুরস্ক একটি রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর সম্পর্ক অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পুতিন তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং এরদোয়ান দুঃখপ্রকাশ করলে তা পরে তুলে নেওয়া হয়।

ন্যাটো সদস্য হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধ না মেনে এরদোয়ান রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছেন।

অন্যদিকে পুতিনও রাশিয়াকে আক্রমণাত্মক চেহারা দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিমারা সিরিয়ার ক্ষমতা থেকে বাশার আল–আসাদকে সরানোর জন্য যখন জেনেভায় সম্মেলন করছিলেন, তখন কাজাখস্তানের আস্তানা শহরে পুতিন তুরস্ক, ইরানসহ কয়েকটি দেশকে নিয়ে আরেকটি সম্মেলন করছিলেন। ওই সময় পুতিন স্পষ্ট করে পশ্চিমাদের পাল্টা একটি বিকল্প জোটশক্তির ধারণা দিয়েছিলেন। রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছিল, কিন্তু এই ঘটনার পরই তিনি নিজের দেশবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

এখন নিজের দেশের ভেতরে এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা পড়ে যাওয়ার পর তিনি পুতিনের পথ ধরেছেন। লিবিয়ায় পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের অনীহার সুযোগে সেখানে এরদোয়ান হাত বাড়িয়েছেন। রাশিয়ায় সিরিয়ার হস্তক্ষেপের পরই লিবিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্ককে সেখানে হস্তক্ষেপের আমন্ত্রণ জানায়।

পুতিন যেভাবে তার দেশের ওপর ইউরোপের জ্বালানিনির্ভরতাকে প্রাধান্য বিস্তারে কাজে লাগান, একইভাবে এরদোয়ান ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের একইভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এমনিভাবে নানা দিক থেকে পুতিনের কৌশলকে অনুসরণ করছেন এরদোয়ান।

এই অবস্থায় এরদোয়ানের সঙ্গে ইইউর একটি যৌক্তিক বোঝাপড়ায় পৌঁছানো দরকার। তুরস্ককে ইইউভুক্ত করা হবে কি না, সে বিষয় দ্রুত ফয়সালায় আসতে হবে। তুরস্কের সামনে মুলা ঝুলিয়ে রেখে তাকে আর প্রশমিত করা যাবে না। এতে ইইউর ক্ষতি হবে বেশি। কারণ, ইইউর ঐক্য ভেঙে দেওয়া এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য এমনিতেই রাশিয়া ও চীন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে তুরস্কও যদি বিরুদ্ধে যায়, তাহলে ইইউর পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
মার্ক লিওনার্ড: ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের পরিচালক

Spread the love

আপনার মতামত লিখুন